'বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে মাগধী প্রাকৃত থেকে।' এ মতের প্রবক্তা কে?
" বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে মাগধী প্রাকৃত থেকে" - এ মতের প্রবক্তা ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি " The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL)" নিয়ে গবেষণা করেন এবং পরবর্তীতে মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম এই মতবাদ প্রকাশ করেন।
Related Questions
অপভ্রংশ বলতে মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষার (তথা প্রাকৃত ও পালি ভাষার) পরবর্তী ঐতিহাসিক ধাপকে বোঝায়। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থে সর্বপ্রথম "অপভ্রংশ" শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত কিছু অশিষ্ট শব্দকে নির্দেশ করার জন্য শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য প্রত্যক্ষভাবে অপভ্রংশ (বিশেষ করে মাগধী অপভ্রংশ)-এর কাছে ঋণী।
প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে প্রাকৃত ভাষার উদ্ভব হয়। পরবর্তীতে এই প্রাকৃত ভাষার পরিবর্তিত ও বিকৃত রূপ হিসেবে অপভ্রংশ এবং অবহট্ট ভাষার সৃষ্টি হয়। আর এই অবহট্ঠ বা অবহট্ট । রূপ থেকেই কালক্রমে আধুনিক বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। বাংলা ভাষার বিকাশের ধাপগুলো সাধারণত নিম্নরূপ: বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষা: বাংলা ভাষার মূল উৎস। প্রাকৃত ভাষা: সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, যার মধ্যে মাগধী প্রাকৃত প্রধান। অবহট্ঠ বা অবহট্ট : প্রাকৃতের আরও পরিবর্তিত রূপ। অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ শুরু করে। বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির শুরুতেও অপভ্রংশের প্রভাব দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ-এর ভাষা মূলত অপভ্রংশ ওবাংলা ভাষার মিশ্রণে তৈরি।
- প্রাকৃত বা প্রাকৃত ভাষা কথাটির তাৎপর্য হলো প্রকৃতির অর্থাৎ জনগণের কথ্য ও বোধ্য ভাষা।
- এক পর্যায়ে এ প্রাকৃত ভাষাই ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রভাবে, কথ্য ভাষার উচ্চারণের বিভিন্নতা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে।
- এ প্রাকৃত ভাষাই আঞ্চলিক বিভিন্নতা নিয়ে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত হয়। যেমন - মাগধী প্রাকৃত,মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত,শৌরসেনী প্রাকৃত ইত্যাদি।
- মাগধি প্রাকৃতের অপভ্রংশ থেকেই কালক্রমে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে উৎপত্তি লাভ করে বাংলা ভাষা।
প্রাকৃত অর্থ স্বাভাবিক, প্রাকৃত ভাষার নামকরণ প্রসঙ্গে কেউ কেউ বলেন যে, এর প্রকৃতি বা মূল হচ্ছে 'সংস্কৃত', তাই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত বলে এর নাম হয়েছে প্রাকৃত। আবার কেউ কেউ বলেন, 'প্রকৃতি' অর্থ সাধারণ জনগণ এবং তাদের ব্যবহূত ভাষাই প্রাকৃত ভাষা, অর্থাৎ প্রাকৃত জনের ভাষা প্রাকৃত ভাষা।
মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে এ মতবাদ দিয়েছেন স্যার জর্জ গ্রিয়ার্সন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এ মত সমর্থন করেছেন। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন- গৌড়ীয় প্রাকৃত হতে বাংলা ভাষার উদ্ভব।
বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে এককথায় - "ইন্দো ইউরোপীয় →শতম →ইন্দো আর্য →ভারতীয় →প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা →প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্যভাষা →গৌড়ী প্রাকৃত →গৌড় অপভ্রংশ →বঙ্গ-কামরূপী →বাংলা ও অসমীয়া।"
বাংলা ভাষা নব্য ভারতীয় আর্যভাষা (New Indo-Aryan) গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তবে এর মূল উৎপত্তি হয়েছে আর্যভাষার প্রাচীন স্তর থেকে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হওয়া মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার শেষ রূপ মাগধী প্রাকৃত এবং তার পরবর্তী স্তর অপভ্রংশ ও অবহট্ঠ থেকে।
জব সলুশন